ঢাকা ০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাসের সাক্ষী ‘খোঁজার দীঘি’ আজ বিলুপ্তির পথে, নেই সংরক্ষণের উদ্যোগ




 

কোহিনূর আলম, নিজস্ব প্রতিনিধি:

যথাযথ সংরক্ষণ, সংস্কার ও তদারকির অভাবে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার কান্দিউড়া ইউনিয়নের জফরপুর গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘খোঁজার দীঘি’ ও এর আশপাশের প্রাচীন প্রত্ননিদর্শনগুলো বিলুপ্তির পথে। দীর্ঘদিনের অবহেলায় দীঘির চারপাশের প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ঢেকে গেছে মাটি, গুল্মলতা ও জঙ্গলে।

ঐতিহাসিক এই স্থানের এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাসপ্রেমীরা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে দীঘি ও প্রত্ননিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করে এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তরে জফরপুর গ্রামে অবস্থিত খোঁজার দীঘি। প্রায় ১৮ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল জলাশয়ের নামকরণ ও ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়ভাবে রয়েছে নানা মত ও জনশ্রুতি।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাংলার প্রখ্যাত আফগান শাসক খাজা উসমান খান লোহানীর নামের সঙ্গে দীঘিটির সম্পর্ক রয়েছে। কারও কারও মতে, তাঁর খনন করা ‘খাজা দীঘি’ কালক্রমে মানুষের মুখে ‘খোঁজার দীঘি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। আবার অন্য একটি মত অনুসারে, মুঘল আমলে স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী খাজা বা খাঁ উপাধিধারী ব্যক্তি প্রজাদের পানীয় জলের সংকট দূর করতে দীঘিটি খনন করেন। এ ছাড়াও কথিত আছে খোঁজা মানে নপুংসক ৷ তখনকার খোঁজা এক শাসক এটি খনন করেছিলেন বলেই এর নাম ‘খোঁজার দীঘি’! তবে এসব মতের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও প্রামাণ্য গবেষণা।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল জলাশয়ের উপড়ে বৈকালিক বিভিন্ন পাখির নৈসর্গিক উড়ে বেড়ানো । তবে জমেছে কচুরিপানার জাগ । দীঘির চারপাশে রয়েছে গাছপালা ও ঝোপঝাড়। এর মধ্যেই পাড়ঘেঁষে টিকে আছে প্রাচীন মসজিদ ও পুরোনো অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ এবং উঁচু টিলার মতো স্থাপনার চিহ্ন। প্রাচীন ইট ও সুরকির এসব নিদর্শনের বেশির ভাগই মাটি ও জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। বড় একটি কুয়ার কথাও জানা যায়৷ যদিও এর কোন অস্তিত্বই নেই৷ অন্যদিকে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় এবং নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানের সংরক্ষণে দৃশ্যমান সরকারি উদ্যোগ নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সঠিক পরিচয়, নির্মাণকাল ও ঐতিহাসিক পটভূমি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় গবেষণা না হওয়ায় এর প্রকৃত ইতিহাসও অনেকের অজানা রয়ে গেছে। খোঁজার দীঘির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ পর্যটকদের আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা রাখে।

উপজেলা সদর থেকে সহজেই রিকশা বা মোটরসাইকেলে সেখানে যাওয়া যায়। তবে যাওয়ার সড়কটি মাটির ও কিছু অংশ বেহাল অবস্থায় রয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বসার স্থান, শৌচাগার, তথ্যকেন্দ্র কিংবা দিকনির্দেশনামূলক ফলক। আশপাশে পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও নেই বললেই চলে । ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্থানটি এখনো পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে নি।

স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমীদের মতে, কেন্দুয়ার রোয়াইলবাড়ী দুর্গের মতো খোঁজার দীঘিও এ অঞ্চলের অতীত রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করতে পারে। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, জরিপ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এর প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব। একই সঙ্গে দীঘির পরিবেশ রক্ষা, প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিতকরণ এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত খোঁজার দীঘি পরিদর্শন করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ করুক। প্রয়োজনীয় গবেষণা শেষে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা, অবৈধ দখল থাকলে তা উচ্ছেদ, দীঘির পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং যাতায়াত ও দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

তাঁদের আশঙ্কা, এখনই উদ্যোগ নেওয়া না হলে অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে কেন্দুয়ার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন। তাই সময় থাকতে খোঁজার দীঘি সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এসকে/এনকে

আরও পড়ুন :  দুর্গাপুরের সাদামাটি ও চীনা মাটির পাহাড় ঘিরে পর্যটন নগরী গড়ার স্বপ্ন, আশাবাদ ডেপুটি স্পিকারের

এসকেনিউজ২৪ | সত্যের পথে কলমের সাথে | দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদে চোখ রাখুন 

আপনার মতামত প্রকাম করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার প্রদত্ত তথ্য আমাদের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে

প্রকাশকের তথ্য

সর্বাধিক পঠিত

ইতিহাসের সাক্ষী ‘খোঁজার দীঘি’ আজ বিলুপ্তির পথে, নেই সংরক্ষণের উদ্যোগ

ইতিহাসের সাক্ষী ‘খোঁজার দীঘি’ আজ বিলুপ্তির পথে, নেই সংরক্ষণের উদ্যোগ

প্রকাশের সময় : ০৫:০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

 

কোহিনূর আলম, নিজস্ব প্রতিনিধি:

যথাযথ সংরক্ষণ, সংস্কার ও তদারকির অভাবে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার কান্দিউড়া ইউনিয়নের জফরপুর গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘খোঁজার দীঘি’ ও এর আশপাশের প্রাচীন প্রত্ননিদর্শনগুলো বিলুপ্তির পথে। দীর্ঘদিনের অবহেলায় দীঘির চারপাশের প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ঢেকে গেছে মাটি, গুল্মলতা ও জঙ্গলে।

ঐতিহাসিক এই স্থানের এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাসপ্রেমীরা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে দীঘি ও প্রত্ননিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করে এলাকাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তরে জফরপুর গ্রামে অবস্থিত খোঁজার দীঘি। প্রায় ১৮ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল জলাশয়ের নামকরণ ও ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়ভাবে রয়েছে নানা মত ও জনশ্রুতি।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাংলার প্রখ্যাত আফগান শাসক খাজা উসমান খান লোহানীর নামের সঙ্গে দীঘিটির সম্পর্ক রয়েছে। কারও কারও মতে, তাঁর খনন করা ‘খাজা দীঘি’ কালক্রমে মানুষের মুখে ‘খোঁজার দীঘি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। আবার অন্য একটি মত অনুসারে, মুঘল আমলে স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী খাজা বা খাঁ উপাধিধারী ব্যক্তি প্রজাদের পানীয় জলের সংকট দূর করতে দীঘিটি খনন করেন। এ ছাড়াও কথিত আছে খোঁজা মানে নপুংসক ৷ তখনকার খোঁজা এক শাসক এটি খনন করেছিলেন বলেই এর নাম ‘খোঁজার দীঘি’! তবে এসব মতের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও প্রামাণ্য গবেষণা।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল জলাশয়ের উপড়ে বৈকালিক বিভিন্ন পাখির নৈসর্গিক উড়ে বেড়ানো । তবে জমেছে কচুরিপানার জাগ । দীঘির চারপাশে রয়েছে গাছপালা ও ঝোপঝাড়। এর মধ্যেই পাড়ঘেঁষে টিকে আছে প্রাচীন মসজিদ ও পুরোনো অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ এবং উঁচু টিলার মতো স্থাপনার চিহ্ন। প্রাচীন ইট ও সুরকির এসব নিদর্শনের বেশির ভাগই মাটি ও জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। বড় একটি কুয়ার কথাও জানা যায়৷ যদিও এর কোন অস্তিত্বই নেই৷ অন্যদিকে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় এবং নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানের সংরক্ষণে দৃশ্যমান সরকারি উদ্যোগ নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সঠিক পরিচয়, নির্মাণকাল ও ঐতিহাসিক পটভূমি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় গবেষণা না হওয়ায় এর প্রকৃত ইতিহাসও অনেকের অজানা রয়ে গেছে। খোঁজার দীঘির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ পর্যটকদের আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা রাখে।

উপজেলা সদর থেকে সহজেই রিকশা বা মোটরসাইকেলে সেখানে যাওয়া যায়। তবে যাওয়ার সড়কটি মাটির ও কিছু অংশ বেহাল অবস্থায় রয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত বসার স্থান, শৌচাগার, তথ্যকেন্দ্র কিংবা দিকনির্দেশনামূলক ফলক। আশপাশে পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও নেই বললেই চলে । ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্থানটি এখনো পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে নি।

স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমীদের মতে, কেন্দুয়ার রোয়াইলবাড়ী দুর্গের মতো খোঁজার দীঘিও এ অঞ্চলের অতীত রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করতে পারে। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, জরিপ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এর প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব। একই সঙ্গে দীঘির পরিবেশ রক্ষা, প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিতকরণ এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুত খোঁজার দীঘি পরিদর্শন করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ করুক। প্রয়োজনীয় গবেষণা শেষে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা, অবৈধ দখল থাকলে তা উচ্ছেদ, দীঘির পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং যাতায়াত ও দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

তাঁদের আশঙ্কা, এখনই উদ্যোগ নেওয়া না হলে অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে কেন্দুয়ার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন। তাই সময় থাকতে খোঁজার দীঘি সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এসকে/এনকে

আরও পড়ুন :  দুর্গাপুরের সাদামাটি ও চীনা মাটির পাহাড় ঘিরে পর্যটন নগরী গড়ার স্বপ্ন, আশাবাদ ডেপুটি স্পিকারের

এসকেনিউজ২৪ | সত্যের পথে কলমের সাথে | দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদে চোখ রাখুন