ঢাকা ১০:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খালেকদাদ চৌধুরীর ৪১তম প্রয়াণ দিবসে নেত্রকোনায় স্মরণসভা



নেত্রকোনা প্রতিনিধি :

বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক খালেকদাদ চৌধুরীর সাহিত্যকীর্তি ও জীবনাদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বানের মধ্য দিয়ে নেত্রকোনায় তাঁর ৪১তম প্রয়াণ দিবস পালিত হয়েছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সাহিত্যচর্চায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান নূরু ও পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম।

স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন খালেকদাদ চৌধুরীর ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, অধ্যাপক ননীগোপাল সরকার, প্রবীণ সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল এবং জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক খন্দকার অলিউল্লাহ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক কবি তানভীর জাহান চৌধুরী।

বক্তারা বলেন, খালেকদাদ চৌধুরী শুধু একজন কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক ছিলেন না, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলা প্রয়োজন। তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আরও চর্চা এবং গবেষণার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।

সাহিত্যচর্চায় সমৃদ্ধ এক জীবন

খালেকদাদ চৌধুরী ১৯০৭ সালে নেত্রকোনার মদন উপজেলার চানগাঁও গ্রামে তাঁর নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস আটপাড়া উপজেলার সোনাজোর গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তৈরি হয়।

মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কবি আব্দুল কাদির, আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলামসহ তৎকালীন বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিকের সান্নিধ্য লাভ করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তিনি ১৯৪৪ সালে প্রাদেশিক প্রচার বিভাগের মাঠপর্যায়ের “প্রচারক” পদে সরকারি চাকুরিতে যোগ দেন। এটি ছিল তৃণমূল বা মাঠপর্যায়ের একটি অ-গেজেটেড কারিগরি/মাঠ সেবা পদ, যা তৎকালীন কাঠামোর ৩য় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে গণ্য হতো।  প্রচারকদের মূল কাজই ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি জনসংযোগ তৈরি করা। তথাপি তিনি দুই বাংলায় খ্যাতিমান একজন সাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত।

রাজনৈতিক জীবনেও খালেকদাদ চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি নেত্রকোণা মহকুমা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘রক্তাক্ত অধ্যায়’, ‘চাঁদবেগের গড়’ ও ‘এ মাটি রক্তে রাঙা’। অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মরু সাহারায়’, ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’ ও ‘বেদুঈনের মেয়ে’। এ ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক ‘অভিশপ্ত মসনদ’ ও ‘বহ্নিশিখা’ এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বিশ্বসাহিত্য পরিচয়’।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ খালেকদাদ চৌধুরী ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৫ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর প্রয়াণের চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলা সাহিত্য ও নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে খালেকদাদ চৌধুরীর অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।

এসকে/এনএম

আরও পড়ুন : ​পূর্বধলায় মহাসপ্তমীর মধ্য দিয়ে শুরু হলো দুর্গাপূজা

এসকেনিউজ২৪ | সত্যের পথে কলমের সাথে  | নেত্রকোনার খবরসহ দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদে চোখ রাখুন। 

One thought on “খালেকদাদ চৌধুরীর ৪১তম প্রয়াণ দিবসে নেত্রকোনায় স্মরণসভা”

আপনার মতামত প্রকাম করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার প্রদত্ত তথ্য আমাদের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে

প্রকাশকের তথ্য

সর্বাধিক পঠিত

কেন্দুয়ায় তাঁতী দলের কর্মী সম্মেলন, কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে নতুন দাবি

খালেকদাদ চৌধুরীর ৪১তম প্রয়াণ দিবসে নেত্রকোনায় স্মরণসভা

প্রকাশের সময় : ০৫:৩৪:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

নেত্রকোনা প্রতিনিধি :

বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক খালেকদাদ চৌধুরীর সাহিত্যকীর্তি ও জীবনাদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বানের মধ্য দিয়ে নেত্রকোনায় তাঁর ৪১তম প্রয়াণ দিবস পালিত হয়েছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সাহিত্যচর্চায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান নূরু ও পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম।

স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন খালেকদাদ চৌধুরীর ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, অধ্যাপক ননীগোপাল সরকার, প্রবীণ সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল এবং জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক খন্দকার অলিউল্লাহ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক কবি তানভীর জাহান চৌধুরী।

বক্তারা বলেন, খালেকদাদ চৌধুরী শুধু একজন কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক ছিলেন না, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলা প্রয়োজন। তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আরও চর্চা এবং গবেষণার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।

সাহিত্যচর্চায় সমৃদ্ধ এক জীবন

খালেকদাদ চৌধুরী ১৯০৭ সালে নেত্রকোনার মদন উপজেলার চানগাঁও গ্রামে তাঁর নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস আটপাড়া উপজেলার সোনাজোর গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তৈরি হয়।

মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কবি আব্দুল কাদির, আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলামসহ তৎকালীন বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিকের সান্নিধ্য লাভ করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তিনি ১৯৪৪ সালে প্রাদেশিক প্রচার বিভাগের মাঠপর্যায়ের “প্রচারক” পদে সরকারি চাকুরিতে যোগ দেন। এটি ছিল তৃণমূল বা মাঠপর্যায়ের একটি অ-গেজেটেড কারিগরি/মাঠ সেবা পদ, যা তৎকালীন কাঠামোর ৩য় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে গণ্য হতো।  প্রচারকদের মূল কাজই ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি জনসংযোগ তৈরি করা। তথাপি তিনি দুই বাংলায় খ্যাতিমান একজন সাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত।

রাজনৈতিক জীবনেও খালেকদাদ চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি নেত্রকোণা মহকুমা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘রক্তাক্ত অধ্যায়’, ‘চাঁদবেগের গড়’ ও ‘এ মাটি রক্তে রাঙা’। অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মরু সাহারায়’, ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’ ও ‘বেদুঈনের মেয়ে’। এ ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক ‘অভিশপ্ত মসনদ’ ও ‘বহ্নিশিখা’ এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বিশ্বসাহিত্য পরিচয়’।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ খালেকদাদ চৌধুরী ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৫ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর প্রয়াণের চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলা সাহিত্য ও নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে খালেকদাদ চৌধুরীর অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।

এসকে/এনএম

আরও পড়ুন : ​পূর্বধলায় মহাসপ্তমীর মধ্য দিয়ে শুরু হলো দুর্গাপূজা

এসকেনিউজ২৪ | সত্যের পথে কলমের সাথে  | নেত্রকোনার খবরসহ দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদে চোখ রাখুন।