
নিজস্ব প্রতিনিধি || এসকেনিউজ২৪
একসময় গান, আবৃত্তি, নাটক আর তবলার তালে মুখর থাকত নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। বিকেল হলেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী ও শিশু-কিশোরদের পদচারণে প্রাণ ফিরে পেত উপজেলা শহর। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে মোহনগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির নিয়মিত কার্যক্রম। শুধু তাই নয়, একসময় প্রতিষ্ঠানটিতে থাকা হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, তবলা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশেরও এখন কোনো হদিস নেই। এসব সরঞ্জাম কোথায় রয়েছে বা কী অবস্থায় আছে, সে বিষয়ে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও বিস্তারিত তথ্য নেই।
এর মধ্যেই ২০২৩ সালে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সোয়া দুই একর জমির ওপর নির্মিত এই বিশাল কেন্দ্রে রয়েছে তিনতলা একাডেমি ভবন, মিলনায়তন, জাদুঘর, ৩১০ আসনের মাল্টিপারপাস কনফারেন্স হল ও মুক্তমঞ্চ। কিন্তু নির্মাণের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে নিয়মিত কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন শুরু হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ফলে একদিকে পুরোনো শিল্পকলা একাডেমি কার্যত নিষ্প্রাণ, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও পড়ে আছে অনেকটা নীরব-নিস্তব্ধ অবস্থায়।
একসময় ছিল প্রাণচাঞ্চল্য
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশির দশকে ‘শিল্পকলা পরিষদ’ নামে মোহনগঞ্জে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যাত্রা শুরু হয়। উপজেলা পরিষদের একটি হলরুমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। পদাধিকার বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি এবং স্থানীয় একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিকে সাধারণ সম্পাদক করা হতো।
নব্বইয়ের দশকে মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল বেশ সমৃদ্ধ। পলাশ-শিমুল, মুক্তস্বর, মুকুল ফৌজ, অনির্বাণসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীদের পদচারণে মুখর থাকত শহর। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগেও গান, তবলা, হারমোনিয়াম, নাটকসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। শিশু-কিশোরদেরও এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হতো।
গান, তবলা ও হারমোনিয়াম শেখাতে অমল সরকার, রুকনুজ্জামান, আরিফাসহ কয়েকজন প্রশিক্ষকও যুক্ত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়ে এবং ২০১০ সালের দিকে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
চালুর উদ্যোগ, কিন্তু ফেরেনি প্রাণ
২০১৮-১৯ সালের দিকে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয় এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমল সরকারকে আহ্বায়ক করা হয়। শিক্ষার্থী ভর্তি করতে ফরমও ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
অমল সরকার বলেন, স্থানীয়ভাবে তাঁরা শিল্পকলা একাডেমি চালুর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ এগোয়নি।
তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমির কমিটি গঠনে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে কমিটি করলে স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় তৈরি হয় না।
বাদ্যযন্ত্র গেল কোথায়?
একসময় মোহনগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে ছিল হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, তবলা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম। এগুলো দিয়ে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন পরিচালনা করা হতো।
কিন্তু বর্তমানে এসব সরঞ্জামের বড় একটি অংশ কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অমল সরকারের দাবি, অনেক সরঞ্জাম পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে। কিছু সরঞ্জাম কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে গেছেন—এমন কথাও তিনি শুনেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রশাসনিক ভবনের পরিত্যক্ত মালামালের গুদামে কিছু বাদ্যযন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকার কথাও জানান তিনি।
সরকারি বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন
শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি বরাদ্দ এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব অর্থ কোন খাতে, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে—তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অভিযোগ করেন, প্রতিবছর বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের পর তা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
৫০ কোটি টাকার কেন্দ্রেও নেই আয়োজন
শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম যখন দীর্ঘদিন ধরে স্থবির, তখন ২০২৩ সালে নির্মাণ করা হয় শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার পাশাপাশি বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশের লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নির্মাণের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে কার্যকর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু না হওয়ায় হতাশ স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
তাদের প্রশ্ন—এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সাংস্কৃতিক অবকাঠামো যদি ব্যবহারই না হয়, তাহলে এর সুফল পাবে কারা?
সংস্কৃতিচর্চা কমায় বাড়ছে হতাশা
সূর্যমুখী থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, বর্তমানে মোহনগঞ্জে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ। একসময় কবি রইস মনরমের বাসায় সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো। সেটিও এখন অনেকটা কমে গেছে।
হাওরাঞ্চলের কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক রইস মনরম বলেন, একসময় মোহনগঞ্জ শিল্প-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল। অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীর চর্চায় শহরটি মুখর থাকত। এখন সেই পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
তাঁর মতে, তরুণদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানো জরুরি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার সঙ্গে তরুণদের যুক্ত রাখা গেলে তাদের মানসিক বিকাশের পাশাপাশি মাদক থেকেও দূরে রাখা সম্ভব।
খতিয়ে দেখা হবে বরাদ্দের হিসাব
মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন বলেন, শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আগের কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কোথায় রয়েছে, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সারা দেশেই শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর আগে প্রতিবছর শিল্পকলা একাডেমির জন্য সরকারি বরাদ্দ আসত। সেই টাকা কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।
ইউএনও আরও জানান, কিছুদিনের মধ্যে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চিঠি আসার কথা রয়েছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রত্যাশা, শুধু কমিটি গঠন বা সরকারি বরাদ্দ দেওয়াতেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক, শিশু-কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করা হবে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্র ও অতীতের সরকারি বরাদ্দের অর্থের হিসাবও খতিয়ে দেখা হবে।
একসময় যে শিল্পকলা একাডেমি ছিল মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র, দীর্ঘদিনের স্থবিরতায় সেটিই এখন প্রায় নিষ্প্রাণ। পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিপুল অর্থে নির্মিত নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও। এখন স্থানীয়দের অপেক্ষা—কবে খুলবে শিল্পকলার তালা, কবে ফিরবে সাংস্কৃতিক প্রাণচাঞ্চল্য, আর মিলবে হারিয়ে যাওয়া সরঞ্জাম ও বরাদ্দের অর্থের হিসাব?
এসকে/এনএম
আরো পড়ুন : ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কেন্দুয়ায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতার আহ্বান
সম্পাদনা_দেলোয়ার হোসেন মাসুদ 




















One thought on “৫০ কোটির সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও নীরব, তালাবদ্ধ শিল্পকলায় হারিয়ে গেছে বাদ্যযন্ত্র”