
নিজস্ব প্রতিনিধি | এসকেনিউজ২৪
নেত্রকোণার মদন উপজেলার তিয়শ্রী ইউনিয়নের বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে মগড়া নদীর ভাঙন থেকে রক্ষায় প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া জরুরি প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী উপকরণ ব্যবহার না করা, শুকনো বালুর পরিবর্তে ভেজা বালু এবং শক্ত কাঠের বল্লার পরিবর্তে গাছের ডাল ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনায় গত ২০ সেপ্টেম্বর হোসাইন কবির নামে এক ব্যক্তি জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে ঠিকাদার ও প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মগড়া নদীর ভাঙন থেকে বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয়ে ৮০ মিটার এলাকায় জরুরি ভাঙন রোধ প্রকল্প নেওয়া হয়।
প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী ১২ মিটার লম্বা ১৩টি শক্ত কাঠের বল্লা—সোনালু, তেঁতুল বা জামগাছের কাঠ দিয়ে—পাইলিং করার কথা। পাশাপাশি ৮০ মিটার দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে ৩৯টি ব্যারাক বাঁশের পাইলিং, ওয়ালিং পিস ২০ মি.মি. নাট-বল্টু দিয়ে আটকানো, ২৫০ কেজি ওজনের ৩ হাজার ১২৫টি জিও-ব্যাগে শুকনো বালু ডাম্পিং এবং ১৭৫ কেজি ওজনের ১ হাজার ২১০টি শুকনো বালুর জিও-ব্যাগ প্লেসিং করার কথা রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের না জানিয়েই ঠিকাদার নিজের মতো করে প্রকল্পের কাজ করেছেন। জিও-ব্যাগে শুকনো বালুর পরিবর্তে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে। পাইলিংয়ের ক্ষেত্রে শক্ত কাঠের বল্লার পরিবর্তে মেহগনি গাছের ডাল ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী কোনো মালামালই ব্যবহার করা হয়নি এবং প্রকল্প তদারকি কর্মকর্তার যোগসাজশে ঠিকাদার ইচ্ছামতো কাজ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ চলাকালে অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরে বাগজান গ্রামের সচেতন কয়েকজন ব্যক্তি স্থানীয় ইউপি সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে একবার কাজ বন্ধ করে দেন। পরে প্রাক্কলন সম্পর্কে এলাকাবাসীকে কিছু না জানিয়েই আবার কাজ শুরু করে শেষ করা হয়।
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী ভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ করেছেন ঠিকাদার। তবে কাজের মান ও ব্যবহৃত উপকরণ নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বাগজান গ্রামের আশরাফুল ইসলাম আকন্দ বলেন, “স্কুল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প দেওয়ার খবর শুনে খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে নিজের মতো করে কাজ শুরু করায় হতাশ হয়েছি। প্রাক্কলনে কী আছে, তা কাউকে জানতে দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে—এটাই আমাদের দাবি।”
একই গ্রামের পুতুল মিয়া বলেন, “কাজে কী করা হয়েছে, তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পানি কমে যাওয়ায় পুরো চিত্র দেখা যাচ্ছে। এভাবেই দেশের টাকা লুটপাট করা হয়—এই কাজটি দেখলেই তা বোঝা যায়।”
তিয়শ্রী ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ বলেন, “ঠিকাদার একদিন আমাকে ডেকে একটি বালুর বস্তা ওজন করে দেখান। ব্যাগে ২৮০ কেজি বালু ছিল। তবে জিও-ব্যাগের ভেতরে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে। এস্টিমেটে কী আছে, তা আমি জানি না।”
অভিযোগকারী হোসাইন কবির বলেন, “বাগজান স্কুল রক্ষা প্রকল্পে অনিয়ম বললে ভুল হবে, এখানে এক কথায় সাগর চুরি হয়েছে। এই লুটপাটের কাজে ঠিকাদারকে টাকার বিনিময়ে সহযোগিতা করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান। আশা করি কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।”
তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারের প্রতিনিধি উজ্জ্বল তালুকদার। তিনি বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, ডিসি স্যার অভিযোগ পেয়ে তাদের ডেকেছেন। তবে আমরা কাজে কোনো অনিয়ম করিনি।”
অভিযোগের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কোনো প্রকল্প দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারের বক্তব্য নিতে পারেন।”
বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর ঠিকাদার বালুভর্তি জিও-ব্যাগ নদীতে ফেলার সময় আমাকে বা পিয়নকে ডেকে নিয়েছেন। তবে এর আগে বল্লাসহ যা ব্যবহার করা হয়েছে, তা পরিবর্তন করা হয়নি। জিও-ব্যাগে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন হলো কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রাক্কলন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারিনি।”
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “মদন উপজেলার বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নদী ভাঙন রোধ প্রকল্পে অনিয়মের একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে।”
এসকে/এনএস
সম্পাদনায়_দেলোয়ার হোসেন মাসুদ 




















One thought on “মদনে ২০ লাখ টাকার স্কুল রক্ষা প্রকল্পে ‘সাগর চুরি’র অভিযোগ”