ঢাকা ০৮:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোয়াইল বাড়ি দুর্গ : ইতিহাস, কিংবদন্তি আর সুরঙ্গের রহস্য




 

কোহিনূর আলম, নিজস্ব প্রতিনিধি | এসকেনিউজ২৪ 

নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি আমতলা ইউনিয়নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক রোয়াইলবাড়ি দুর্গ, স্থানীয়ভাবে যা ‘কোটবাড়ি দুর্গ’ বা ‘দরগাহ’ নামেও পরিচিত। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২-১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বেতাই নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রত্নস্থাপনাটি ইতিহাস, লোককথা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক অনন্য সমন্বয়।

প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষকদের ধারণা, দুর্গটি চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সুলতানি আমলে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এর সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে এটি সুলতানি আমলের স্থাপনা, আবার কেউ কেউ মুঘল আমলের সঙ্গে এর স্থাপত্যিক যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করেন। স্থানীয় লোককথায় দুর্গটির সঙ্গে ঈশা খাঁর নামও জড়িয়ে আছে।

নিয়ামত বিবি ও এক হারিয়ে যাওয়া নগরের কিংবদন্তি:
রোয়াইলবাড়ি দুর্গকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে নানা কাহিনি। কথিত আছে, বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর গড়ে ওঠার আগে এ অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই নগর নির্মাণে ১২ জন শ্রমিক কাজ করতেন এবং ১৩ জনের খোরাকি নেওয়া হতো।

লোককথা অনুযায়ী, শ্রমিকদের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন নিয়ামত বিবি। অতিরিক্ত একজনের খোরাকি কেন নেওয়া হচ্ছে—এ নিয়ে একসময় প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু এর কোনো উত্তর না দিয়েই অভিমান করে নিয়ামত বিবি বড় একটি রান্নার চুলোয় ডুবে আত্মগোপন করেন—এমন গল্প স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। দুর্গের উত্তরে থাকা প্রাচীন কবরস্থানটি স্থানীয়দের কাছে ‘নিয়ামত বিবির মাজার’ ও ‘ডেঙ্গুমিয়ার সমাধি’ নামে পরিচিত।
তবে এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে স্থানীয় লোককথা হিসেবেই দেখা হয়।

সুরঙ্গ নিয়ে রহস্য:
রোয়াইলবাড়ি দুর্গের সঙ্গে একটি প্রাচীন সুরঙ্গের কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, এটি ছিল দুর্গের গোপন যাতায়াতের পথ। তৎকালীন দুর্গ বা রাজকীয় স্থাপনায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে গোপন পথ ব্যবহারের নজির থাকলেও রোয়াইলবাড়ির এই সুরঙ্গের প্রকৃত ব্যবহার ও নির্মাণকাল নিয়ে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আধার:
আশির দশকে রোয়াইলবাড়ি দুর্গের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯১-৯৩ সালে পরিচালিত প্রাথমিক খননকাজে প্রাচীন ইটের ভগ্নাংশ, মৃৎপাত্র, মূর্তি ও অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

দুর্গ এলাকায় রয়েছে পাঁচটি পুকুর, একটি প্রধান দরজা, প্রবেশদ্বার ও প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। উল্লেখযোগ্য প্রত্নস্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—বারদুয়ারী ঢিবি, বুরুজ ঢিবি, ছাদবিহীন পুরাতন ইমারত ও প্রাচীন কবরস্থান।
ইটের তৈরি দুর্গের দেয়াল ও বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আজও অতীতের স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহন করছে।

পর্যটকদের আকর্ষণ, রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও:
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের কোলাহল ও নাগরিক ব্যস্ততা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করছেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের প্রতি আগ্রহী দর্শনার্থীদের কাছেও স্থানটি দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি দুর্গের চারপাশে দেয়াল ও গেট নির্মাণসহ বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা হলেও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনো সীমিত। নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার, খাবারের ব্যবস্থা ও বিশ্রামাগার। পাশাপাশি যাতায়াতব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধারও উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঐতিহাসিক এই প্রত্নস্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য রাস্তাঘাট, স্যানিটারি ব্যবস্থা, বিশ্রামাগারসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে রোয়াইলবাড়ি দুর্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

এ বিষয়ে কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী বলেন, দুর্গটিকে আরও পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যতটুকু কাঁচা রাস্তা রয়েছে, তা পাকাকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে দর্শনার্থীদের যাতায়াতে কোন কষ্ট না হয়।

এসকে/এনকে

আরো পড়ুন : কেন্দুয়ায় যত্রতত্র পার্কিং ও রাস্তা দখলে ৩ মামলা, জরিমানা

আপনার মতামত প্রকাম করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার প্রদত্ত তথ্য আমাদের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে

প্রকাশকের তথ্য

সর্বাধিক পঠিত

কেন্দুয়ায় তাঁতী দলের কর্মী সম্মেলন, কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে নতুন দাবি

রোয়াইল বাড়ি দুর্গ : ইতিহাস, কিংবদন্তি আর সুরঙ্গের রহস্য

প্রকাশের সময় : ১২:১৯:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

কোহিনূর আলম, নিজস্ব প্রতিনিধি | এসকেনিউজ২৪ 

নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি আমতলা ইউনিয়নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক রোয়াইলবাড়ি দুর্গ, স্থানীয়ভাবে যা ‘কোটবাড়ি দুর্গ’ বা ‘দরগাহ’ নামেও পরিচিত। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২-১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বেতাই নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রত্নস্থাপনাটি ইতিহাস, লোককথা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক অনন্য সমন্বয়।

প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষকদের ধারণা, দুর্গটি চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সুলতানি আমলে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এর সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে এটি সুলতানি আমলের স্থাপনা, আবার কেউ কেউ মুঘল আমলের সঙ্গে এর স্থাপত্যিক যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করেন। স্থানীয় লোককথায় দুর্গটির সঙ্গে ঈশা খাঁর নামও জড়িয়ে আছে।

নিয়ামত বিবি ও এক হারিয়ে যাওয়া নগরের কিংবদন্তি:
রোয়াইলবাড়ি দুর্গকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে নানা কাহিনি। কথিত আছে, বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর গড়ে ওঠার আগে এ অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই নগর নির্মাণে ১২ জন শ্রমিক কাজ করতেন এবং ১৩ জনের খোরাকি নেওয়া হতো।

লোককথা অনুযায়ী, শ্রমিকদের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন নিয়ামত বিবি। অতিরিক্ত একজনের খোরাকি কেন নেওয়া হচ্ছে—এ নিয়ে একসময় প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু এর কোনো উত্তর না দিয়েই অভিমান করে নিয়ামত বিবি বড় একটি রান্নার চুলোয় ডুবে আত্মগোপন করেন—এমন গল্প স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। দুর্গের উত্তরে থাকা প্রাচীন কবরস্থানটি স্থানীয়দের কাছে ‘নিয়ামত বিবির মাজার’ ও ‘ডেঙ্গুমিয়ার সমাধি’ নামে পরিচিত।
তবে এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে স্থানীয় লোককথা হিসেবেই দেখা হয়।

সুরঙ্গ নিয়ে রহস্য:
রোয়াইলবাড়ি দুর্গের সঙ্গে একটি প্রাচীন সুরঙ্গের কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, এটি ছিল দুর্গের গোপন যাতায়াতের পথ। তৎকালীন দুর্গ বা রাজকীয় স্থাপনায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে গোপন পথ ব্যবহারের নজির থাকলেও রোয়াইলবাড়ির এই সুরঙ্গের প্রকৃত ব্যবহার ও নির্মাণকাল নিয়ে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আধার:
আশির দশকে রোয়াইলবাড়ি দুর্গের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯১-৯৩ সালে পরিচালিত প্রাথমিক খননকাজে প্রাচীন ইটের ভগ্নাংশ, মৃৎপাত্র, মূর্তি ও অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

দুর্গ এলাকায় রয়েছে পাঁচটি পুকুর, একটি প্রধান দরজা, প্রবেশদ্বার ও প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। উল্লেখযোগ্য প্রত্নস্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—বারদুয়ারী ঢিবি, বুরুজ ঢিবি, ছাদবিহীন পুরাতন ইমারত ও প্রাচীন কবরস্থান।
ইটের তৈরি দুর্গের দেয়াল ও বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আজও অতীতের স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহন করছে।

পর্যটকদের আকর্ষণ, রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও:
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের কোলাহল ও নাগরিক ব্যস্ততা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করছেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের প্রতি আগ্রহী দর্শনার্থীদের কাছেও স্থানটি দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি দুর্গের চারপাশে দেয়াল ও গেট নির্মাণসহ বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা হলেও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনো সীমিত। নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার, খাবারের ব্যবস্থা ও বিশ্রামাগার। পাশাপাশি যাতায়াতব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধারও উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঐতিহাসিক এই প্রত্নস্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য রাস্তাঘাট, স্যানিটারি ব্যবস্থা, বিশ্রামাগারসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে রোয়াইলবাড়ি দুর্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

এ বিষয়ে কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী বলেন, দুর্গটিকে আরও পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যতটুকু কাঁচা রাস্তা রয়েছে, তা পাকাকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে দর্শনার্থীদের যাতায়াতে কোন কষ্ট না হয়।

এসকে/এনকে

আরো পড়ুন : কেন্দুয়ায় যত্রতত্র পার্কিং ও রাস্তা দখলে ৩ মামলা, জরিমানা