
উজ্জ্বল রায়, নড়াইল প্রতিনিধি ||এসকেনিউজ২৪
জন্ম থেকেই একটি পা অচল। লাঠির ভরসায় চলাফেরা করলেও থেমে নেই জীবনসংগ্রাম। নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের পানতিতা গ্রামের বাসিন্দা গোপী বিশ্বাস (৩২) প্রতিদিন ইলেকট্রনিক পণ্য মেরামতের কাজ করে স্ত্রী-সন্তানসহ চার সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের চেষ্টা করছেন। তবে সীমিত আয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই যেন তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গোপী বিশ্বাস বাবা নিতাই বিশ্বাস ও মা কল্পনা বিশ্বাসের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তৃতীয় শ্রেণির পরই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই এলাকার একটি দোকানে কাজ শেখার মাধ্যমে টর্চ লাইট, গ্যাস লাইটসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামতের দক্ষতা অর্জন করেন। প্রায় ১৯ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত থাকলেও জীবিকার তাগিদে মাঝে মাঝে ভ্যান চালানো, চা বিক্রি ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজও করেছেন।
বর্তমানে মুলিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে একটি ছোট্ট টিনের দোকানে টর্চ লাইট, গ্যাস লাইট, এলইডি বাল্ব, স্প্রে মেশিন ও রাইস কুকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য মেরামত করেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আয় হয়, ভালো দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আসে। সংসারের চাহিদা পূরণে এই আয় একেবারেই অপ্রতুল। কাজের সন্ধানে কখনো কখনো এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে পাশের হাটেও যেতে হয় তাকে।
গোপী বিশ্বাস বলেন, “আজ একটু হলুদ কিনি, কাল একটু লবণ। ছেলেমেয়েদের নিয়মিত মাছ খাওয়াতে পারি না। দেনা করেই সংসার চালাতে হয়। প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা পেলেও তা বেশিরভাগই দেনা শোধে চলে যায়।”
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি সরকারের প্রতি সহায়তার আবেদন জানিয়ে বলেন, “আমাদের মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে সন্তানদের মানুষ করতে পারব। ওরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, গোপী বিশ্বাস দক্ষ ও বিশ্বস্ত একজন মেরামতকারী। তার কাজের ওপর এলাকার অনেক মানুষ নির্ভরশীল। মুলিয়া বাজারে লাইট মেরামত করতে আসা মিলন সরকার বলেন, “গোপীর কাজের মান ভালো। তার কষ্ট দেখে খারাপ লাগে, কিন্তু আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে।”
কোড়গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ রায় বলেন, “সংগ্রামী এই মানুষটির পাশে সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান দাঁড়ালে তার পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।”
মুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, “গোপী বিশ্বাস প্রতিবন্ধী হয়েও আত্মসম্মান নিয়ে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করা হবে।”
জীবনের প্রতিটি দিন সংগ্রামের হলেও আত্মসম্মান আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছেন গোপী বিশ্বাস। তার প্রত্যাশা—সহানুভূতি নয়, কর্মসংস্থানের আরও সুযোগ এবং সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
এসকে/এনইউ
আরো পড়ুন : চন্দ্রগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সাথে পানিসম্পদ মন্ত্রীর মতবিনিময়
সম্পাদনা_দেলোয়ার হোসেন মাসুদ 
















