কোহিনূর আলম, নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাংলার লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’র মূল সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে। তাঁকে বাংলার লোকঐতিহ্যের রূপকারও বলা যায়।
নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার আইথর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই লোকসাহিত্য সংগ্রাহক তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত অসংখ্য লোকগাথা, পালাগান ও প্রেমকাহিনি সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর সংগৃহীত লোকসাহিত্য বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
চন্দ্রকুমার দে ১৮৮৯ সালে কেন্দুয়া উপজেলার আইথর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রাম কুমার দের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল একই উপজেলার রাঘবপুর গ্রামে। অল্প বয়সেই তিনি বাবা-মাকে হারান। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও সীমিত ছিল। সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান অর্জন করলেও জীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এবং গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দেয়।
জীবিকার তাগিদে প্রথমে একটি মুদি দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন তিনি। পরে তারানাথ তালুকদারের অধীনে মাসিক দুই টাকা বেতনে কর আদায়ের কাজে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে গৌরীপুরের জমিদারিতে মাসিক আট টাকা বেতনে গোমস্তার দায়িত্ব পান। কর আদায়ের কাজে বিভিন্ন গ্রামে যাতায়াতের সুবাদে তিনি গ্রামীণ কবি, গায়েন ও পালাকারদের সংস্পর্শে আসেন। তাঁদের কণ্ঠে পরিবেশিত পালাগান ও লোকগাথা শুনে সেগুলো সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করার কাজে মনোনিবেশ করেন।
১৯১২ সালে ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত ‘সৌরভ’ পত্রিকায় লোকসাহিত্যবিষয়ক তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির সম্পাদক কেদারনাথ মজুমদার তাঁর প্রতিভা উপলব্ধি করেন এবং সাহিত্যজগতে পরিচিতি পেতে সহযোগিতা করেন। ১৯১৩ সালে একই পত্রিকার ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’। প্রবন্ধটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লোকসাহিত্য গবেষক দীনেশচন্দ্র সেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
চন্দ্রকুমার দের সংগ্রহ ও গবেষণাকর্মে মুগ্ধ হয়ে দীনেশচন্দ্র সেন তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। এরপর তিনি আরও নিবিড়ভাবে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত লোকগাথা ও পালাগান সংগ্রহে আত্মনিয়োগ করেন। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে টিকে থাকা বহু সাহিত্যিক নিদর্শন তাঁর সংগ্রহের মাধ্যমে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়।
চন্দ্রকুমার দের সংগৃহীত লোকসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সংকলন ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত এই সংকলনে স্থান পায় ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’, ‘চন্দ্রাবতী’, ‘দেওয়ানা মদিনা’, ‘দস্যু কেনারামের পালা’, ‘কঙ্ক ও লীলা’, ‘দেওয়ান ভাবনা’, ‘কাজলরেখা’ ও ‘রূপবতী’র মতো বিখ্যাত পালা। এসব লোকগাথায় গ্রামীণ জীবনের প্রেম-বিরহ, সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক অনুভূতি, সংগ্রাম ও তৎকালীন সমাজের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে।
এ ছাড়া তাঁর সংগৃহীত লোকসাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’ ১৯২৩ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এতে ‘ধোপার পাট’, ‘মইষাল বন্ধু’, ‘কমলা রাণীর গান’, ‘দেওয়ান ঈশা খাঁ’, ‘ভেলুয়া’, ‘আয়না বিবি’ ও ‘গোপিনী কীর্তন’-এর মতো পালা স্থান পেয়েছে। এসব পালার উল্লেখযোগ্য অংশ সংগ্রহ করা হয়েছিল পূর্ব ময়মনসিংহের বর্তমান নেত্রকোণা অঞ্চল এবং বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে।
চন্দ্রকুমার দের অবদান শুধু কিছু গান বা কাহিনি সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর উদ্যোগে গ্রামীণ সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৌখিকভাবে প্রচলিত বহু লোকগাথা লিখিত রূপ পায়। ফলে বাংলার লোকজ জীবন, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ-অনুভূতি নিয়ে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংরক্ষিত হয়। তাঁর সংগৃহীত পালাগান বাংলা লোকসাহিত্যকে দেশ-বিদেশের গবেষক ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পরিচিত করতেও ভূমিকা রাখে।
তবে এই কৃতিত্বের পেছনে চন্দ্রকুমার দের পাশাপাশি দীনেশচন্দ্র সেনসহ তৎকালীন লোকসাহিত্য গবেষক ও সংগ্রাহকদের সম্মিলিত অবদানও স্মরণীয়। সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী সংকলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
চন্দ্রকুমার দে ১৯৪৬ সালে ময়মনসিংহের নওমহলে বসবাসকালে এস কে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। পরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে কেওয়াটখালী শ্মশানঘাটে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে সেখানে ছাতার আকৃতির একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেটি ভেঙে দেয় বলে জানা যায়।
চন্দ্রকুমার দের জীবন ও কর্ম আজও বাংলা লোকসাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয়। তাঁর জন্মভূমি কেন্দুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকগাথা সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অথচ তাঁর স্মৃতি চিহ্ন বলতে রয়েছে একটি ম্যূরাল । তাই চন্দ্রকুমার দের জীবন ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় ইতিহাস, লোকসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চা আরও সমৃদ্ধ হবে মনে করেন স্থানীয়রা ।
এসকে/এনকে
আরও পড়ুনঃ কেন্দুয়ায় আইনশৃঙ্খলা সভা: অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
এস কে নিউজ ২৪ । সত্যের পথে কলমের সাথে । দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদে চোখ রাখুন
SK NEWS 24 BD সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন মাসুদসহ-সম্পাদক : নূরুল আমীন। অস্থায়ী কার্যালয়: ১৬৪, খতিবনগুয়া, হাসপাতাল রোড, নেত্রকোনা-২৪০০।
Copyright © 2026 SKNEWS24BD. All rights reserved.