
দেলোয়ার হোসেন মাসুদ :
নেত্রকোনা কি ক্রমেই অস্ত্রসন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে? একের পর এক গুলির ঘটনা, প্রকাশ্যে সশস্ত্র হামলা এবং প্রাণহানির ঘটনায় এমন প্রশ্ন এখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অথচ নেত্রকোনার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত হন রূপসী বাংলা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ। উৎরাইল বাজারে একটি দোকানে বসে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ও আশ্রয় কেড়ে নেয়নি, বরং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একজন সাংবাদিককে এভাবে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত।
এই শোক ও উদ্বেগ কাটতে না কাটতেই ১৮ অক্টোবর ভোরে মোহনগঞ্জ পৌরশহরের মাইলোড়া এলাকায় রামকৃষ্ণ মন্দিরের পাশে সুজন পাল নামে এক যুবককে গুলি করার ঘটনা সামনে আসে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সাংবাদিক আলিফ হত্যার মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে আরেক যুবককে গুলি করার ঘটনা জনমনে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, অস্ত্রধারীরা যদি এভাবে গুলি চালিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ? অপরাধীরা কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে? অবৈধ অস্ত্রের উৎস কোথায়? কারা এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে, আর কী কারণে বারবার এমন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।
অপরাধ দমনে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কিংবা মামলা গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অপরাধ প্রতিরোধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করা এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অস্ত্রের ব্যবহার ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, সেসব এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা এবং অপরাধপ্রবণ চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও মোহনগঞ্জের সাম্প্রতিক গুলির ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করলে চলবে না। প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ, ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস, হামলাকারীদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য যোগসূত্র নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। তবে তদন্তের আগে কোনো ঘটনা বা অপরাধী চক্রের মধ্যে সম্পর্ক আছে বলে ধরে নেওয়াও সমীচীন নয়।
অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক শক্তি যা-ই থাকুক না কেন, আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীর পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে শিথিলতা দেখানো হলে আইনের শাসন দুর্বল হয় এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ পায়।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
সাংবাদিক আলিফ হত্যার ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সাংবাদিকেরা সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, অপরাধ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরেন। সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের কারণে কোনো সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হলে তা শুধু সংবাদমাধ্যমের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কিংবা অপরাধীদের দায়মুক্তির ধারণা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না।
প্রশাসনের কাছে জনগণের প্রত্যাশা
নেত্রকোনার মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান। তাঁরা চান না, বাজারে বসে থাকা, কর্মস্থলে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হওয়াও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠুক। প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মূল্য সমান। তাই একজন সাংবাদিক, একজন ব্যবসায়ী কিংবা একজন সাধারণ যুবক—যে-ই সহিংসতার শিকার হোন না কেন, তাঁর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কয়েকটি দাবি স্পষ্ট:
১. সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
২. মোহনগঞ্জে সুজন পালকে গুলি করার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৩. জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস শনাক্ত, অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
৪. দুর্গাপুর, মোহনগঞ্জসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অপরাধ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
৫. অপরাধ দমনে গৃহীত পদক্ষেপ ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করতে হবে, যাতে প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হোক
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপের প্রতিফলনও দেখতে চায় জনগণ। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। আর কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন সন্ত্রাসী হামলার শিকার না হন, সেই লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে প্রশাসনকে।
সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিচার এবং মোহনগঞ্জে গুলির ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এখন জনদাবি। এসব ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা গেলে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হবে। অন্যথায় একের পর এক সহিংসতার ঘটনা জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়াবে।
নেত্রকোনা কোনো অপরাধীদের জন্য অভয়ারণ্য হতে পারে না। এই জেলার মানুষ শান্তি চান, নিরাপত্তা চান, আইনের শাসন চান। তাঁরা আশ্বাসের চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান।
প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট—মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কতটা প্রস্তুত, আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি কোথায়?
এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অবৈধ অস্ত্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। নেত্রকোনার মানুষের মনে নিরাপত্তার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ, একটি সভ্য সমাজে মানুষের জীবন কখনোই সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের কাছে জিম্মি থাকতে পারে না।
এসকে/এনএম
আরও পড়ুন : সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিচার দাবিতে পূর্বধলায় মানববন্ধন, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি
এসকেনিউজ২৪ | সত্যের পথে কলমের সাথে | নেত্রকোনার খবরসহ দেশ-বিদেশের সর্বশেষ সংবাদে চোখ রাখুন
সম্পাদনা_দেলোয়ার হোসেন মাসুদ 





















