নিজস্ব প্রতিনিধি | এসকেনিউজ২৪
নেত্রকোণার রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কজন নেতা দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের কর্ম, সাহস ও নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান খান তাঁদের অন্যতম। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন জেলার প্রবীণ রাজনীতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেওয়া এই রাজনীতিককে তাঁর অনুসারীরা ‘নেত্রকোণার সিংহপুরুষ’ হিসেবেও অভিহিত করতেন।
আজ ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৮ সালের এই দিনে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে স্মরণ করছেন।
১৯৩৩ সালের ১ মার্চ নেত্রকোণা সদর উপজেলার কুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফজলুর রহমান খান। তাঁর বাবা ইদ্রিছ আলী খান এবং মা ফজরেন্নেসা খানম। স্থানীয় শিক্ষাজীবন শেষে তিনি নেত্রকোণা আঞ্জুমান হাই স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক এবং পরে নেত্রকোণা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং নেত্রকোণা কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন রোজ গার্ডেন সম্মেলনে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবেও অংশ নেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কারাবরণ করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন এবং পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সময় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে জনমত গঠনে তাঁর ভূমিকার কথাও বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ফজলুর রহমান খান নেত্রকোণার সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ নেত্রকোণায় গঠিত সংগ্রাম পরিষদে তাঁকে সদস্য করা হয়েছিল বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। পরে তিনি কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ-২৩ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৬ সালে নেত্রকোণা-৩ এবং ১৯৯৬ সালে নেত্রকোণা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ তিনি মোট তিনবার জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন।
জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেও তাঁর দীর্ঘ সময়ের উপস্থিতি ছিল। বিভিন্ন সূত্রে ১৯৭৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়—এমন স্মৃতিচারণও রয়েছে। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় সাংগঠনিক সফর এবং রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ছিল তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে প্রবীণদের স্মৃতিতে উঠে আসে।
ফজলুর রহমান খান সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। নেত্রকোণায় রেডক্রিসেন্ট কার্যক্রম বিস্তারে তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের অনুরাগী—এমন স্মৃতিচারণ রয়েছে। নেত্রকোণার বাউল, জারি, কিচ্ছাগান ও ভাটিয়ালি গানের আসরে তাঁর উপস্থিতির কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন লেখায়।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি তিনি ধারণ করতেন, সেটিকে তাঁর অনুসারীরা তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কারাবরণ, আন্দোলন-সংগ্রাম, সংসদীয় রাজনীতি ও দলীয় নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে ফজলুর রহমান খান নেত্রকোণার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে আছেন। ২০০৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুতে অবসান ঘটে দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের।
মৃত্যুর ১৮ বছর পরও তাঁর কর্মময় রাজনৈতিক জীবন নেত্রকোণার প্রবীণ রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় ফিরে আসে—একজন সংগঠক, সংসদ সদস্য ও দীর্ঘদিনের দলীয় নেতা হিসেবে।
এসকে/এনএম
আরো পড়ুন : মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও মানহানিকর বক্তব্যের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
SK NEWS 24 BD সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন মাসুদসহ-সম্পাদক : নূরুল আমীন। অস্থায়ী কার্যালয়: ১৬৪, খতিবনগুয়া, হাসপাতাল রোড, নেত্রকোনা-২৪০০।
Copyright © 2026 SKNEWS24BD. All rights reserved.