শ্রাবণের মাঝামাঝি সময়। রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
নির্জন রাস্তার পাশের ফুটপাত ধরে তন্ময় হয়ে হাঁটছে তরু। বয়স সাতাশ-আটাশের কাছাকাছি। চোখেমুখে এক ধরনের অস্থিরতা, অথচ হাঁটার মধ্যে যেন কোনো তাড়া নেই। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে—সেটাও যেন ঠিক জানে না।
হঠাৎ পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—লতা।
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ—
—কিরে তরু, কেমন আছিস?
—এই তো আছি রে লতা। তুই কেমন আছিস?
—ভালো আছি। শোন, পরশু বাড়ি আসছি। তুই কিন্তু হাতে কোনো কাজ রাখবি না। আমি সন্ধ্যার আগেই চলে আসব।
তরু একটু অবাক হয়ে বলল—
—তাই?
—হুম।
—আচ্ছা, চেষ্টা করব।
—চেষ্টা না! তুই সব কাজ তার আগেই সেরে রাখবি। আমি দুই-তিন দিন থাকব।
তরু হেসে বলল—
—দুই-তিন দিন থাকলে কাজ সেরে রাখতে হবে কেন?
—আরে হাঁদারাম, ভুলে গেছিস? পরশু রাখীপূর্ণিমা! পূর্ণিমার রাতে পুকুরঘাটে বসে চাঁদ দেখব। বুঝেছিস?
—ওহ! আচ্ছা! তাই বলি, সব কাজ গুছিয়ে রাখতে হবে কেন! আচ্ছা, তুই আয়। কোনো সমস্যা নেই।
ফোনটা কেটে গেল।
লতা আর তরু প্রায় সমবয়সী। দুজনের বন্ধুত্ব অনেক দিনের। এমন বন্ধুত্ব, যেখানে না বলা কথাগুলোও কখনো কখনো বলা কথার চেয়ে বেশি অর্থ বহন করে।
তরু পড়াশোনা শেষ করেছে বেশ কিছুদিন হলো। এখন অনেকটা বেকারই ঘুরে বেড়ায়। চাকরির বাজারের অবস্থা ভালো নয়। সরকারি চাকরিতে মামা-খালু না থাকলে সুযোগ পাওয়া কঠিন, আর বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
একটি গার্মেন্টস কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগে চাকরি করত তরু। হঠাৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মালিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে তরুর দিন কাটছে।
কী করবে, কীভাবে আবার নতুন করে শুরু করবে—কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
এসব ভাবতে ভাবতেই আজ রাতে হাঁটছিল সে।
লতার ফোনকল যেন তার চিন্তার জাল ছিঁড়ে দিল। রাতও অনেক হয়েছে। তাই ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল তরু।
বাসায় ফিরে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় গেল। কিন্তু চোখ বন্ধ করেও তার মাথা থেকে চিন্তাগুলো সরল না।
অন্যদিকে লতাও যেন নিজের মতো করে একটি ছোট্ট পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
লতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষে পড়ছে। থাকে বেগম রোকেয়া হলে। প্রতি শ্রাবণেই কোনো না কোনোভাবে বাড়িতে এসে পূর্ণিমার রাতে বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরঘাটে বসে জোছনা বিলাস করা তার পুরোনো অভ্যাস।
এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
ক্লাস ফাঁকি দিয়েই এবার বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
বিছানায় শুয়ে লতা ভাবছিল—এবার কীভাবে জমবে তাদের জোছনার আড্ডা!
ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, নিজেও টের পেল না।
আজ রাখীপূর্ণিমা।
ক্লাস শেষ করে দুপুরেই বাসে উঠল লতা। বাস ছাড়তেই তরুকে ফোন দিল।
—এই তরু, কোথায় রে তুই?
—এই তো, লাঞ্চের সময় হচ্ছে। লাঞ্চ করে একটু বের হব। তুই কোথায়? রওনা দিয়েছিস?
—হুম। মাত্র বাস ছাড়ল।
—ঠিক আছে, তুই এসে আমাকে কল দিস।
—ওকে। আর শোন, তুই সোহাগ, মনি, রায়হান আর রুপাকে বলে দিস—সন্ধ্যার পর যেন সবাই পুকুরঘাটে চলে আসে।
—ঠিক আছে। রাখছি।
সন্ধ্যার আগেই লতা বাড়ি পৌঁছে গেল।
ব্যাগটা রেখে ফ্রেশ হয়ে অল্প কিছু নাস্তা করল। এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। চারপাশ যেন ধীরে ধীরে রুপালি আলোয় ভেসে যাচ্ছে।
লতা তরুকে ফোন দিল।
—কই রে তোরা?
—এই তো পুকুরঘাটে। রায়হান আর মনি চলে এসেছে। তুই কই?
—আমি আসছি। দুই মিনিট অপেক্ষা কর। রুপা আর সোহাগকে কল দে।
—আচ্ছা, দিচ্ছি। তুই আয়।
এক এক করে রুপা, সোহাগও চলে এল। সবশেষে লতা।
শুরু হলো তাদের বহুদিনের চেনা সেই আড্ডা।
পুকুরের পানিতে চাঁদের আলো দুলছে। চারপাশে নীরব রাত, তার মাঝখানে বন্ধুদের হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর গান।
তরু গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করল—
‘মধুমালতি ডাকে আয়…’
গলার স্বর খুব একটা ভালো নয়। কিন্তু সেদিন তার গানে যেন অন্যরকম একটা প্রাণ ছিল। গান শেষ হতেই সবাই হাততালি দিয়ে উঠল।
কেউ কবিতা আবৃত্তি করল, কেউ কৌতুক বলল। হাসি-ঠাট্টায় কখন যে রাত গভীর হয়ে গেল, কেউ টেরই পেল না।
ঘড়িতে তখন রাত প্রায় দুইটা।
রুপা হাই তুলে বলল—
—আমার কিন্তু প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। আমি এবার যাব। তোরা কী করবি?
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল—
—চল, এবার যাওয়া যাক।
এক এক করে সবাই চলে গেল যে যার বাড়ির পথে।
জোছনা রাত
লতা বিছানায় শুয়ে আছে প্রায় এক ঘণ্টা।
কিন্তু ঘুম আসছে না।
চোখ বন্ধ করলেই পুকুরঘাটের সেই জোছনা, বন্ধুদের হাসি আর রাতের আড্ডা মনে পড়ছে।
হঠাৎ মনে হলো—তরুকে একটা ফোন দিই।
যেই ভাবা, সেই কাজ।
ফোন করতেই তরু রিসিভ করল।
—কিরে, ঘুমাসনি লতা?
—নারে। ঘুম আসছে না।
—আমারও আসছে না। কী করি বল তো?
—কি করবি?
—ভাবছি।
একটু নীরবতার পর তরু বলল—
—এই লতা, শোন।
—বল না।
—পুকুরঘাটে আসবি?
লতা একটু অবাক হয়ে বলল—
—আসলে কী হবে?
—কী আর হবে? তোরও ঘুম আসছে না, আমারও না। তুই এলে গল্প করব।
—তাই?
—হুম।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে লতা বলল—
—আচ্ছা, আসছি।
তরু ফোনটা রেখে আবার পুকুরঘাটে এসে বসল।
ভরা চাঁদ তখন পুকুরের পানিতে জ্বলজ্বল করছে। মাঝে মাঝে মেঘ এসে চাঁদটাকে আড়াল করছে, আবার মেঘের ফাঁক গলে চাঁদ ভেসে উঠছে।
মনে হচ্ছে, আকাশ আর পানির মাঝে চলছে আলো-আঁধারির এক নীরব জলকেলি।
তরু সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে ছিল।
কখন যে লতা এসে তার পাশে বসেছে, সে টেরই পায়নি।
লতা গলাখাঁকারি দিয়ে বলল—
—কিরে, কখন এলাম, টেরই পেলি না? বললি তো গল্প করবি!
গলাখাঁকারি শুনে তরু যেন চমকে উঠল।
—আরে! কখন এলি টেরই পেলাম না।
—তুই তো পুকুরের দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছিস।
—ওহ! খেয়াল করিনি রে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর তরু বলল—
—তোর পড়াশোনা কেমন চলছে লতা?
—চলছে মোটামুটি। ক্লাসের খুব চাপ যাচ্ছে। কয়েকদিন পরই ফরম ফিলাপ হবে। অনার্সটা কমপ্লিট হলে মোটামুটি বেঁচে যাই রে। তারপর শুধু মাস্টার্স।
—হুম।
আবার নীরবতা।
পুকুরের পানিতে চাঁদের প্রতিচ্ছবি দুলছে। দূরে কোথাও রাতজাগা কোনো পাখি ডেকে উঠল।
কথা বলতে বলতে কখন যে তরুর হাত লতার কাঁধে এসে ঠেকেছে, তরু নিজেই টের পেল না।
লতা চমকে উঠলেও কিছু বলল না।
এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল দুজনের মাঝে।
তরু ধীরে ধীরে লতার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
কেউ কিছু বলল না।
কথা থেমে গেল, কিন্তু অনুভূতিগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
হাতের সেই সামান্য স্পর্শে দুজনের বুকের ভেতরেই যেন অচেনা এক আলো জ্বলে উঠল।
তরুর হঠাৎ মনে হলো—
‘আমি কী করছি?’
সে হাত সরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বলল—
—সরি, লতা।
লতা মৃদু হেসে বলল—
—সরি কেন?
—আমি আসলে ইচ্ছা করে কিছু করিনি। তুই আমাকে ভুল বুঝিস না, প্লিজ।
লতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
—ভুল বুঝলে আমি এখনও তোর পাশে বসে থাকতাম?
তরু লতার দিকে তাকাল।
চাঁদের আলোয় লতার চোখ দুটো যেন আরও গভীর মনে হলো।
তরু ধীরে ধীরে বলল—
—লতা...
—হুম?
—তোকে একটা কথা বলব?
—বল।
—তোকে আমি ভালোবাসি।
লতা মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে বলল—
—এই কথাটা বলতে এত দেরি করলি?
তরু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
লতা এবার তার চোখের দিকে তাকাল।
—কতবার তোকে বলতে চেয়েছি জানিস? কিন্তু সাহস হয়নি। আমিও তোকে ভালোবাসি, তরু।
তরুর মুখে কোনো কথা এল না।
শুধু দুজনের চোখে চোখে যেন অনেক দিনের না বলা কথাগুলো একে একে উচ্চারিত হয়ে গেল।
রাত তখন আরও গভীর।
পুকুরের জলে পূর্ণিমার চাঁদ এখনও জ্বলজ্বল করছে। মেঘ এসে মাঝে মাঝে তাকে আড়াল করছে, আবার সরেও যাচ্ছে।
দুজন মানুষ নীরবে পাশাপাশি বসে রইল।
তারপর একসময় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হারিয়ে গেল অচেনা এক ভালোবাসার অনুভবে।
সেই রাতে তারা শুধু জোছনা দেখেনি—
তারা আবিষ্কার করেছিল, এতদিনের বন্ধুত্বের আড়ালে নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা এক গভীর ভালোবাসাকে।
শ্রাবণের সেই পূর্ণিমা তাই তাদের কাছে শুধু একটি রাত হয়ে থাকল না।
হয়ে রইল—
চিরস্মরণীয় এক ‘জোছনাবিলাস’।
সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন মাসুদসহ-সম্পাদক : নূরুল আমীন। অস্থায়ী কার্যালয়: ১৬৪, খতিবনগুয়া, হাসপাতাল রোড, নেত্রকোনা-২৪০০।
Copyright © 2026 SKNEWS24BD. All rights reserved.