মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, কেন্দুয়া || এসকেনিউজ২৪
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় রথযাত্রা: ভক্তি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক মহোৎসব- আনন্দ র্যালী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আষাঢ় মাস এলেই বাংলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন প্রান্তে।শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টা, উলুধ্বনি, হরিনাম সংকীর্তন আর হাজারো ভক্তের "জয় জগন্নাথ" ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ ও জনপথ। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি রথযাত্রা এখন বাঙালির বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত।
রথযাত্রা মূলত ভগবান জগন্নাথ, তার বড় ভাই বলরাম এবং বোন সুভদ্রার বার্ষিক রথবিহার উৎসব। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে তিন দেবতা নিজ মন্দির থেকে রথে চড়ে মাসির বাড়ি—গুণ্ডিচা মন্দিরে—যাত্রা করেন। সাত দিন বা নয় দিন অবস্থানের পর তারা উল্টো রথ বা 'বাহুদা যাত্রায় মূল মন্দিরে ফিরে আসেন।
রথযাত্রার উৎপত্তি ভারতের ওড়িশার পুরী জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় এক হাজার বছর ধরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশের নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় কয়েকশ বছর ধরে রথযাত্রা উদযাপিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় নওপাড়া ইউনিয়নের দনাচাপুর কালীবাড়ি মন্দির এলাকায় রথযাত্রা উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়, এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- নেত্রকোনা ৩ (কেন্দুয়া- আটপাড়া) সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম, সদস্য জসিম উদ্দিন খোকন, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন খান, উপজেলা যুবদলের আহবায়ক মোঃ মাইন উদ্দিন।
বক্তব্য রাখেন- উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ হাবিবুর রহমান মোসলেম, সাধারণ সম্পাদক মোঃ মজিবুর রহমান ভূইয়া মজনু, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মেঃ মাজহারুল ইসলাম মাজু প্রমুখ।
মহোৎসবে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন-
উপজেলা বিএনপির তথ্য ও বিঃ বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন সালাম।
বক্তৃতায় বক্তব্যে বলেন- সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, রথের দড়ি টানলে পুণ্য লাভ এবং মানুষের পাপ মোচন তাই শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষ রথের দড়ি ধরার জন্য সকাল থেকে অপেক্ষা করেন।
প্রধান অতিথি বলেন- সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষদের নিরাপত্তা অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আমার যা যা করার আমি তাই করছি। কেন্দুয়ার এই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য সকলকে সহযোগিতা করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। এই এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করতে হবে। আমি এই মন্দিরের সামনে রাস্তা পাকাকরণ তিন মাসের মধ্যে শুরু করতে পারবো বলে আসস্ত করতে পারি।
অনেক ভক্তের বিশ্বাস, জগন্নাথদেব নিজেই তার ভক্তদের কাছে আসেন। তাই রথযাত্রা শুধু দেবতার যাত্রা নয়, এটি ভক্ত ও ভগবানের মিলনোৎসব।
রথযাত্রা উপলক্ষে মন্দিরগুলোতে বিশেষ পূজা, কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা, প্রসাদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রথের সঙ্গে থাকে বর্ণিল সাজসজ্জা, ফুল, পতাকা ও আলোকসজ্জা।
কেন্দুয়ায় রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বসে গ্রামীণ মেলা। এসব মেলায় খেলনা, মাটির তৈজসপত্র, মিষ্টি, নাগরদোলা, লোকজ পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের দোকান বসে। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে রথযাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। নানা ধর্মের মানুষও রথযাত্রা দেখতে আসেন, অনেকেই রথ টানতেও অংশ নেন।
এই অংশগ্রহণ দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রতি বছর রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ও শোভাযাত্রার রুটে পুলিশ, আনসার এবং স্বেচ্ছাসেবীরা দায়িত্ব পালন করেন। কোথাও কোথাও সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার ও মেডিকেল টিমও রাখা হয়, যাতে উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।
সময়ের সঙ্গে রথযাত্রার আয়োজনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার, অনলাইন প্রচারণা এবং আধুনিক আলোকসজ্জার মাধ্যমে উৎসব আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তবে মূল আকর্ষণ এখনো সেই ঐতিহ্যবাহী কাঠের রথ, ভক্তদের উচ্ছ্বাস এবং হরিনাম সংকীর্তন।
ধর্মীয় নেতাদের মতে, রথযাত্রার মূল শিক্ষা হলো ভক্তি, মানবতা, সহনশীলতা ও সবার মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া।
বিশ্বায়নের এই সময়ে নানা পরিবর্তনের মধ্যেও রথযাত্রা তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এই উৎসবকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে লালন করে আসছে।
রথযাত্রা তাই কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানুষের মিলন, বিশ্বাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ।
এসকে/এনএস
আরো পড়ুন : হাজিরপাড়া হামিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সাথে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের শুভেচ্ছা বিনিময়
সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন মাসুদসহ-সম্পাদক : নূরুল আমীন। অস্থায়ী কার্যালয়: ১৬৪, খতিবনগুয়া, হাসপাতাল রোড, নেত্রকোনা-২৪০০।
Copyright © 2026 SKNEWS24BD. All rights reserved.